#আমার_অবেলায়_তুমি 

#সানজিদা_বিনতে_সফি(সাথী) 

#পর্ব_২


মারার ফলে গায়ের বিভিন্ন জায়গায় ছোপ ছোপ কালো দাগ হয়ে আছে মধুরিমার। পুরো নাম মধুরিমা দেওয়ান।  বাবা গত হয়েছে ছোট থাকতেই। তার মা আবার বিয়ে করায় তার আশ্রয় হয় মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর বাড়িতে।  নানার বাড়ির কেউ তাকে রাখতে চায় নি। 

এই বাড়িতে কোন কিছুর অভাব নেই।  অভাব শুধু একটা জিনিসের,তা হলো ভালোবাসা, যত্ন। অনেকটা কাজের মেয়ের মতোই তাকে থাকতে হয় এ বাড়ি।  মায়ের ও কোন হেলদোল নেই।  খাইয়ে পরিয়ে রাখছে এই ঢেড়। এখন বিদায় করতে পারলেই বাচে। তাই মাহতাবেদের প্রস্তাব পেয়ে লুফে নেয়। এতটা ও আশা করেনি তারা। বয়স্ক বুড়ো হলেও দিয়ে দিতো। সে তুলনায় মাহতাব তো টাকার কুমির। বয়স দিয়ে কি আশে যায়।


হুট করেই বিয়ে হয়ে যাবে কল্পনাও করেনি মাহতাব।  বড় আপা বললেও সে বিষয় টা সিরিয়াসলি নেয়নি।এভাবে হুট করে বিয়ে হয় নাকি?বললেই তো আর হলো না। কিন্তু হয়ে গেছে।  মাহতাব কে আশ্চর্য হওয়ার সুযোগটাও দেয়নি ময়না বেগম।  কুলসুম বেগম বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলেনি। মেয়ে তার পছন্দ হয়েছে। দেখতে শুনতে মাশআল্লাহ পুতুলের মতো।  কিন্তু বয়স টা একটু কম।তার গম্ভীর ছেলের সাথে মানিয়ে নিতে পারবে তো!


মধুরিমা কে মাহতাবদের সামনে আনতেই মাহতাব অবাক হয়ে যায়। অস্বস্তিতে ঘিরে ধরে তাকে। কয়েকমাস আগে রাস্তায় দেখেছে সে মধরিমা কে। তার সৎ বাবা অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সবার সামনে তাকে মারধর করছিল।  গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কেব নিতে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল মাহতাব। ড্রাইভার গাড়ি আনতে যাওয়ায়  তাকে কিছুক্ষণ সেখানেই দাড়াতে হয়। মধুরিমা কে এভাবে মা*রতে দেখে এগিয়ে যায় সে। ছাড়িয়ে নেয় পাষণ্ড লোকটা থেকে। রাগে গড়গড় করতে করতে লোকটা তার দিকেও তেড়ে আসে। অশালীন গালি দিয়ে ফেলে মা তুলে। শান্ত মাহতাব বাঘের মতো গর্জে উঠে।  মুহুর্তে ঠাটিয়ে চ*ড় লাগায় তার গালে।  অবস্থা অনেকটা বেগতিক দেখে মধুরিমা হাত জোর করে মাফ চায় মাহতাবের কাছে। এর জন্য তাকে অনেক ভুগতে হবে তা চোখের পানিতে বোঝাতে চায়।  মাহতাব পুলিশ কে কল করতে গিয়েও থেমে যায়। অসহায় মধুর চোখের দিকে তাকিয়ে ড্রাইভারের আনা গাড়িতে উঠে চলে যায় সে। 


এখানে এসে মধুরিমার মুখ দেখে কিছু বুঝতে বাকি নেই মাহতাবের। মধুরিমার সৎ বাবা কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে।  ময়না বেগম সহ বাকি সবাই বেশ অবাক হয়েছে মধুরিমার অবস্থা দেখে। লামিয়া গিয়ে একপাশ থেকে জরিয়ে ধরেছে তাকে।  ময়না বেগম কারোর সাথে পরামর্শ না করেই বিয়ের জন্য তাড়া দিলেন ঘটক কে৷ মেয়ের পরিবার গাইগুই করলেও পরে  রাজি হয়ে গেলো।  মাহতাব ইশারায় কিছু বলতে চাইলেও শুনলেন না ময়না বেগম।সে কোন ভাবেই মধুকে রেখে যাবেনা। মাহতাব একবার বলেই ফেললো,


-- আগে ওনার ট্রিটমেন্ট হওয়া জরুরি আপা।


ময়না বেগম গম্ভীর গলায় উত্তর দিলো,

-- আমাদের বাড়ির বউ হয়ে গেলে সব হবে।  আগে অধিকার আদায় করে নেই।


মাহতাব আর কিছু বললো না।  দশ মিনিটে কাজি চলে এলো। তারপর ঘোরের মাঝেই বিয়েটা হয়ে গেলো।  মাহতাব অবশ্য একবার আলাদা কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু ময়না বেগম পাত্তা দেয়নি। ভাইয়ের উপর তার এক আনাও বিশ্বাস নেই। 


বিয়ে হতেই সোজা হয়ে দাড়ালো মাহিতাব। লামিয়া এখনো মধুকে ধরে বসে আছে।  মেয়েটা এখনো কাপছে । মেহরাব কাজি কে এগিয়ে দিতে গিয়েছে৷ 


মেহরাব সোজা মধুর সামনে গিয়ে দাড়ালো।  মধুর গুটিয়ে রাখা হাত টা নিজের হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলো কিছুক্ষণ।  একটা নখ উঠে গেছে। কয়েক জায়গায় সিগারেট দিয়ে পুড়ি*য়ে দিয়েছে। মুধু নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে।  মেহরাব হাত ধরতেই হালকা কেপে উঠলো সে। মেহরাব হাত ছেড়ে মধুর বরাবর বসলো।  ময়না বেগম বারবার তাড়া দিচ্ছে বাসায় যাওয়ার। ভাইয়ের মতিগতি তার ভালো ঠেকছে না। 


মাহতাব ময়না বেগম কে সম্পুর্ন উপেক্ষা করে মধুর মা আলেয়া বেগমের দিকে তাকালো। সে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে মেহরাবের দিকে।বার বার বুয়া কে তাগাদা দিচ্ছে তাদের সামনে নতুন নতুন আইটেম আনার জন্য।  তার স্বামী জয়নাল বেপারী বিরস মুখে বসে আছে।  তার ছেলেরা তার পিছনে দাঁড়িয়ে। ছেলে গুলো কে ভালো করেই চেনে মাহতাব।  বড় ছেলেটা ভালো হলেও বাকি দুইটা বদের হাড্ডি।  


মাহতাব গম্ভীর গলায় মধুকে জিজ্ঞেস করলো, 


-- তোমার গায়ে কে হাত তুলেছে মধু?


মধুরিমা চমকে তাকালো মাহতাবের দিকে।  অনেক গুলো বছর কেউ তাকে এতো সুন্দর করে ডাকেনা। এতটা আবেগ নিয়ে কেন জানতে চাইলো লোকটা? কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিলো সে। মাথা নিচু করে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। ময়না বেগম তড়িঘড়ি করে এসে জরিয়ে ধরলো তাকে।  ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো সে। যেভাবে ধরে ছিল ঠিক সেভাবেই ছেড়ে দিলো ময়না বেগম।  ব্যথায় নীল হয়ে গেছে মধুর ফর্সা আদূরে মুখখানা। 


কুলসুম বেগম চুপ করে বসে আছে।  ছোট ছেলে তাকে আগলে ধরে রেখেছে। তার বিশ্বাস মাহতাব কোন ভুল কাজ করবেনা। তার ছেলে যথেষ্ট বিবেকবান।  অন্যায়ের সাথে আপোষ করা তার ধাতে নেই। 


মাহতাব মেহরাবের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো, 


-- পুলিশ আর এম্বুল্যান্স দুটোতেই কল করো।  আজ এই বেপারি বাড়ির সবাইকে আমি চৌদ্দ শিকের পিছনে দেখতে চাই।  


আলেয়া বেগম মুখ কুচকে ফেললো। স্বামীর দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলল, 


-- এসব কি হচ্ছে জয়নাল? এই মুখপুড়ি আবার কি নাটক শুরু করেছে।  হাড়মাস জ্বা*লিয়ে খেলো। বাপের সাথে ম*রলে বেচে যেতাম।আপদ বিদেয় হতো।


মাহতাবের আগে ময়না বেগম গর্জে উঠলো।  চোখ বড় বড় করে শাসিয়ে বলল,


-- ইব্রাহীম বাড়ির বউ নিয়ে আরেকটা বাজে কথা বললে জিব টেনে ছি*ড়ে ফেলবো। তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি! কাদের সামনে দাড়িয়ে কথা বলছো জানো? এই ঘটক,ভালো করে বুঝিয়ে বলিস নি ওদের বাড়িতে কারা আসছে? 


ঘটক ভেবাচেকা খেয়ে বসে আছে।  ভয়ার্ত চোখে মাহতাব আর ময়না বেগমের দিকে তাকাচ্ছে।  মেহরাব তার নিজের হসপিটালে কল করে এম্বুল্যান্স পাঠাতে বলে দিয়েছে। ডিআইজির সাথেও কথা হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এসে হাজির হবে।  নিজের কাজ শেষ করে মাহতাবের কাছে গিয়ে নিচু গলায় বলল, 


-- আমি ভাবিকে একটু চেকআপ করি ভাইয়া? অবস্থা ভালো ঠেকছে না। ভাবির মনে হয় নিশ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। 


জয়নাল বেপারী কুলকুল করে ঘেমে যাচ্ছে। তার ছোট দুই ছেলে রাগে ফুসছে। বাইরের একটা লোক এসে তাদের হুমকি দিচ্ছে! তাও তাদের বাড়িতে থাকা আশ্রতা মেয়ের জন্য। কালকেও যাকে লাথি মেরে খাওয়া থেকে তুলে দিয়েছে তার জন্য তাদের জেলে যেতে হবে! ভাবতেই রক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে। তার বাবার জন্য কিছু বলতে পারছে না।  নাহলে সব কয়টা কে পুতে দিতো।


-- বেড রুমটা দেখিয়ে দিন। ভাবিকে এভাবে বসিয়ে রাখা যাবে না। কষ্ট হচ্ছে ওনার। 


মেহরাবের কথায় মুখ বাকালো আলেয়া। কাজের লোককে ইশারা করে তার রুমে নিয়ে যেতে বললো। 


মধুকে দাড় করাতেই সে গা ছেড়ে দিলো। মেহরাব আর লামিয়া ধরে ফেললো তাকে৷ মেহরাব কোলে তুলে অচেতন মধুকে নিয়ে শুয়িয়ে দিলো তার রুমে। একটা জীর্নশির্নি রুমে মলিন বিছানা৷ হয়তো কাজের লোকেদের রুম। দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল মাহতাব।  রাগ হচ্ছে তার।  মানুষ এতটা নির্দয় কিভাবে হতে পারে!  আজ এদের রক্তের গরম কমিয়ে বরফ করেই দম নিবে সে।


ময়না বেগম কুলসুম বেগমের গা ঘেঁষে বসলো।  গলার স্বর নিচে নামিয়ে ফিসফিস করে বললো,, 


-- দেখলে মা!কাল অব্দি বিয়ে করতে চাইছিল না।আর,আজ বউ পেতেই কেমন টেংরা মাছের মতো লাফাচ্ছে! কলি যুগ কলি যুগ! (আফসোস করে)


কুলসুম বেগম চুপ করে বসে রইলো। মেয়ে তার পাক্কা অভিনেত্রী।  মাহতাব রেগে গেছে।আজকে বেপারীদের ঘোল খায়িয়ে ছাড়বে। ছেলেগুলো একদম বাপের মতো হয়েছে। বউ পাগলা।


চলবে,,,